নিজের আলিয়া মাদরাসাকে কওমিতে রুপান্তর করেন মাওলানা নুরুল হুদা রহ.

মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক লেখক ও মুহাদ্দিস
দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের যে সকল অঞ্চল সুপরিচিত, ঐতিহাসিকভাবে নোয়াখালীর অবস্থান তার শীর্ষে। যুগযুগ ধরে নোয়াখালীর হাফেজ-কারী-মুন্সী-মৌলভী সাহেবরা

বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্বালিয়েছেন ইসলামের প্রদীপ। শিখিয়েছেন মানুষকে পবিত্র কুরআনের জ্ঞান। তাই নোয়াখালীর নাম শুনলেই বাংলার মানুষের মনে জেগে ওঠে ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ ৷ ভক্তিতে ভরে যায় মন। সমষ্টিগতভাবে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ বিস্তারে

গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি এ অঞ্চলে এমন কিছু মনিষীর জন্ম হয়েছে যাদের নিয়ে শুধু তাদের অঞ্চল নয়, গর্ব করে গোটা বাংলাদেশ বক্ষমান আলোচনার আলোচ্য ব্যক্তি হজরত মাওলানা নুরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহ তেমনি একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ৷ এই মহা মনীষীকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখার, জানার কিংবা বুঝার খুব

একটা সুযোগ আমার হয়ে ওঠেনি ৷ তবে আমার শৈশবকাল থেকেই বাংলাদেশের শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখের নামের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম সারিতেই এই নামটির উল্লেখ থাকতে দেখেছি এমনটা দেখে দেখেই পরিচিত ছিলাম তার নামের সাথে ৷ এছাড়াও আমার আব্বাজান মরহুম শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহর সংগ্রাম ও সাধনার সাথে

ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার সুবাদেও এ নামের প্রতি আশৈশব একটি ভালোলাগার অনুভুতি মিশে আছে ইসলামী আন্দোলন ও সংগ্রামের পথপরিক্রমায় অনেক চড়াই উতরাই আছে ৷ শায়খুল হাদিস রাহিমাহুল্লাহর জীবনও এর ব্যতিক্রম ছিল না ৷ সংগ্রামুখর সেই উত্তাল সময়গুলোতে যারা হজরত শায়খুল হাদিসকে

ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করেছেন, তার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছেন হজরত মাওলানা নুরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহ তাদের অন্যতম ৷ হজরত মাওলানা নূরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহর জীবন পর্যালোচনায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। বিষয়টি হলো বাংলাদেশের সরকারি তথা আলিয়া মাদরাসার অতীত ও বর্তমানের ফারাক ৷ আলিয়া মাদরাসা যেভাবেই হোক যে কারণেই হোক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত ইসলামের অনেক পন্ডিত মনিষী

জন্ম দিয়েছে ৷ তৈরি করেছে অনেক দক্ষ ও যোগ্য আলেমেদীন ৷ বাংলাদেশের খ্যাতিমান শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেমের শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড আলিয়া মাদরাসা। যার অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন হজরত মাওলানা নুরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহ। যদিও তিনি উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে, তদুপরি এ কথা বলা যায় যে, তাঁর বুনিয়াদী শিক্ষা ছিল আলিয়াতেই।তিনি বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গন ও আলেম সমাজের নিকট কতটা

সমাদৃত ছিলেন, তার ইলমী যোগ্যতা কতটুকু স্বীকৃত ছিল, তা বলাই বাহুল্য ৷ আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করে ইলমেদীনের তথা কুরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান আহরণ ও ইলম চর্চার মাধ্যমে তিনি নিজেকে উন্নীত করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়৷ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষা কারিকুলামের মাধ্যমে আল্লামা নুরুল হুদাসহ তার সমকালীন ও পূর্বাপর সময়ে এমন অনেক যোগ্য প্রতিথযশা ও বিদগ্ধ আলেমেদীন তৈরি হয়েছেন, একথা যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই ৷ ঠিক তদ্রুপ আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশই তার মূল ধারা থেকে দূরে সরে এসেছে ৷ এমনকি মাদরাসা শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকেও অনেকটা বিচ্যুত হওয়ার পথে, এটিও অনস্বীকার্য এক বাস্তবতা ৷ আর এ কারণেই মরহুম নুরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহ চৌমুহনী আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু

করলেও মাদরাসায় যখন তার পরিপূর্ণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয় এবং তিনি যখন দেখলেন সরকারি মাদরাসাগুলোর পাঠ্যসূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে, ভবিষ্যতে আরো পরিবর্তন ও বিকৃতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই সাথে পাঠ্যসূচির প্রভাবে তা’লীমের সাথে সাথে তারবিয়াতের দিক থেকেও অধঃপতন নেমে আসছে, তখন সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা উপেক্ষা করে মাদরাসাকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও আদর্শের উপর হেফাজতের লক্ষ্যে কওমীতে রূপান্তরিত করেন, যার দৃষ্টান্ত আজকের সময়ে বিরল। হজরত নুরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহর এই পদক্ষেপ এবং এই সংস্কারকে কোন ধরনের নেতিবাচক অভিধায় অভিহিত করার সুযোগ নেই ৷ এমনকি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখারও অবকাশ নেই ৷ তিনি নিজে আলিয়া মাদরাসা পড়ুয়া হওয়ায় আলিয়া

মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ কিংবা হিংসা তার অন্তরে কখনোই স্থান পাওয়ার কথা নয়। তবে কেন তিনি নিজ কর্মস্থল ও নিজের প্রিয় মাদরাসাটিকে আলিয়া থেকে কওমিতে রূপান্তর করলেন, এই প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করলে এছাড়া আর কোনো সদুত্তর মিলবে না যে, তিনি তার দূরদৃষ্টি ও মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণ চিন্তার আলোকে সুস্পষ্টভাবে এ কথা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে এই জনপদে ইলমে দীন ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ খেদমতের জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারী সিস্টেমের বাইরে গিয়ে খেদমত করতে হবে, যেমনটি কওমি মাদরাসা করছে ৷আর তাই তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত আলিয়া

মাদরাসাকে পর্যায়ক্রমিক ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কওমি মাদরাসায় রূপান্তর ঘটান। তাঁর হাতে এভাবেই গড়ে ওঠে নোয়াখালীর প্রথম দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা চৌমুহনী ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদরাসা। ইতিহাসের একটি বিবর্তনের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে চৌমুহনী ইসলামিয়া মাদরাসা ৷ আল্লামা নূরুল হুদা রাহিমাহুল্লাহর স্মৃতির স্মারক আর কৃতিত্বের স্বাক্ষর হিসাবে ইনশাআল্লাহ এভাবেই ইলমে নববীর আলো বিকিরণ করে যাবে এই মাদরাসা যুগ যুগান্তর।

About Gazi Mamun

Check Also

দুই শত কেজি সোনা দিয়ে তৈরি হলো বিশ্বের বৃহত্তম কোরআন শরীফ

সৃষ্টি হলো এক অনন্য নজির, দুই শত কেজি সোনা দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পবিত্র কোরআন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *