চাকা ঘোরে না তাই বাস শ্রমিকের খাবারও জোটে না

বাসের চাকা ঘুরে না, খাবারও জুটে না। সর্বাত্মক লকডাউনে আমাদের দেখার কেউ নেই। কোথা থেকে খাবার আসবে, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য কেনার টাকা কোথায় পাব- তা জানি না। সরকারের তরফ থেকে কোনো ত্রাণ পাইনি।

শ্রমিক ইউনিয়নও কোনো সহযোগিতা করেনি। মালিকরাও খবর নেন না।’-ক্ষোভের সুরে কথাগুলো বলছিলেন গুলিস্তান (ফুলবাড়িয়া) থেকে চন্দ্রা রুটে চলাচলকারী আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের চালক মো. রাসেল। শুধু রাসেল নয়, এমন ক্ষোভ

প্রকাশ করেছেন গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের অনেক শ্রমিক। বাস শ্রমিকরা জানান, চুক্তিভিত্তিক বা ট্রিপভিত্তিক তাদেরকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। গাড়ি বন্ধ থাকলে তারা কোনো বেতন পান না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ার কারণে লকডাউন দেওয়ায় তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে। আর নৌযান শ্রমিকরা

জানিয়েছেন, তারা বেতনভুক্ত হয়ে লঞ্চে চাকরি করেন।
কিন্তু লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পরই প্রায় অর্ধেক শ্রমিককে বিনা বেতনে ছুটি দেওয়া হয়েছে। কোনো লঞ্চের মালিক শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠিয়েছেন। আবার কোনো কোনো মালিক বিনা বেতনে ছুটি নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় স্বেচ্ছায় শ্রমিকরা বাড়ি চলে গেছেন। ঢাকা থেকে বরিশালের মুলাদী রুটে

চলাচলকারী মিতালী-৪ লঞ্চের খালাসি মো. শাওন যুগান্তরকে বলেন, লকডাউনের পর থেকে লঞ্চ সদরঘাটে অলস পড়ে আছে। ২২ জন শ্রমিকের মধ্যে আমরা ১২ জন লঞ্চ পাহারা দেই। এ কারণে আমাদের বেতন দেওয়া হয়। বাকিদের বিনা বেতনে মালিক ছুটিতে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারণে বেতনও অনিয়মিত হয়ে গেছে। খাবার খোরাকি বাদে মাসে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা বেতন পাই। এপ্রিল মাসের শেষ দিন (৩০ এপ্রিল)

পর্যন্ত ৫০০ বা এক হাজার টাকা করে মোট ৩ হাজার ৬০০ টাকা বেতন দিয়েছে। বাকি তিন হাজার টাকা বকেয়া। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।’ করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ৫ এপ্রিল সারা দেশে লকডাউন জারি করে সরকার। এতে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ৭ এপ্রিল মহানগর এলাকায় শর্তসাপেক্ষে বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হয়ে এখনও বলবৎ আছে। গত ২৬ দিন ধরে কার্যত গণপরিবহন বন্ধ

থাকায় বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা আশপাশের দোকান ও রাস্তায় জটলা হয়ে বসে আছেন। আবার অনেকে ঘোরাঘুরি করছেন। কেউ কেউ গাড়িতে ঘুমাচ্ছেন। তাদেরই একজন আজমেরি গ্লোরী পরিবহনের চালক মো. রাসেল।
তিনি বলেন, লকডাউনের পর দুই তৃতীয়াংশ শ্রমিক ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। আমরা যারা আছি তারা টার্মিনালে পড়ে আছি। আমি এই গাড়ি চালাই। তাই সেটি পাহারা দেই। এজন্য দৈনিক একশ’

টাকা দেন মালিক। এ টাকায় আমাকে পরিবার নিয়ে চলতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাাজরে একশ টাকায় কী হয়?
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের তরফ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। আমাদের দিকে কোনো খেয়াল নেই। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন আরেক গাড়ির কন্ডাক্টর বোরহান উদ্দীন ও গাবতলী-সদরঘাট চলাচলকারী সাত নম্বর রুটের গাড়ির হেলপার মো. ইমন। দীর্ঘদিন লকডাউন থাকায় এক শ্রমিকের মানবেতর জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন সিএনজিচালক মো. সোহাগ। তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জের কানাপট্টিতে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকি।

গাবতলী-সদরঘাট রুটের সাত নম্বর বাসের হেলপার সুজন আমার পাশের বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন। কাজ না থাকায় সুজনের সংসার চলছে না। চরম খারাপ অবস্থা তার। বাধ্য হয়ে আমার বাসা থেকে চাল-ডাল দিয়েছি। এ সিএনজি চালক আরও বলেন, ‘লকডাউনে গাড়ি বন্ধ থাকায় জীবিকার তাগিদে সুজন এখন লেবুর সরবত বিক্রি করছে।’ ইউনিয়ন থেকে শ্রমিকদের কোনো সহযোগিতা না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল আমিন নুরু। তিনি বলেন, আমরা চাঁদা নেই না, তাই শ্রমিকদের সহযোগিতা করতে পারি না। তবে মালিক সমিতির চাঁদা নেয়। তারা সহযোগিতা

করতে পারে। মালিকরা যাতে সহযোগিতা করে সেজন্য দেনদরবার করছি। সরকারি কোনো অনুদান না পেলেও মালিক ও শ্রমিক সংগঠন থেকে দুই দফায় খাদ্য সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন মহাখালী থেকে চলাচলকারী বাস শ্রমিকরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ চলাচলকারী সৌখিন পরিবহনের চালক খায়রুল ইসলাম সবুজ বলেন, দুই দফায় যে খাদ্য সহায়তা পেয়েছে তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। তিনি আরও বলেন, পরিবহন সেক্টরে ১৮ বছর ধরে কাজ করছি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনও হইনি। এমনকি বিএনপির

সরকারবিরোধী আন্দোলন হরতালেও ফাঁকে ফাঁকে গাড়ি চালিয়ে আয় করেছি। প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী কয়েকটি বাসের শ্রমিকরা। তারা বলেন, বাস পাহাড়া দিলে দিনে গাড়িভেদে দুইশ’ থেকে তিনশ’ টাকা দেয় মালিক। সেই টাকায় চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টর- যারা গাড়িতে থাকেন তাদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ২০২০ সালে সারা দেশে ৩২ লাখ চালকের লাইসেন্স সরকারের কাছে জমা দিয়েছিলাম। মাত্র ৪০ শতাংশ শ্রমিককে সরকার সহায়তা দিয়েছে। এবার একজন শ্রমিককেও সহায়তা দেয়নি।

তিনি বলেন, গাবতলী শ্রমিক ইউনিয়নে পাঁচ হাজার সদস্য, মহাখালী শ্রমিক ইউনিয়নে সাত হাজার সদস্য, আন্তঃজেলা শ্রমিক ইউনিয়নে ৪৫ হাজার শ্রমিক সদস্য রয়েছে। সারা দেশে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক রয়েছে। গাড়ি চলাচল না করায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লঞ্চের অর্ধেক শ্রমিক ছুটিতে : ঢাকা-কালাইয়া (পটুয়াখালী) রুটের ঈগল-৫ লঞ্চের কেরানি শ্রী রাধে গোবিন্দ বলেন, লঞ্চের মোট ২২ জন স্টাফের মধ্যে ১৩ জন আছেন। বাকি ৯ জন বিনা বেতনে ছুটিতে আছে। মালিক জানিয়েছে, যারা ছুটিতে বাড়ি থাকবে তারা বেতন পাবে না। আমরা যারা লঞ্চে আছি তারা বেতন পাচ্ছি এবং নাস্তা ভাতা হিসেবে পদক্রম অনুযায়ি ২০ থেকে ১০০ টাকা পাই। সেটা দিয়েই চলছি। তিনি আরও বলেন, এভাবে অলস বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। ঢাকা-চাঁদপুর রুটের সোনারতরী লঞ্চের লস্কর মো. ইউসুফ বলেন, মার্চ মাসের বেতন এখনও পাইনি। এপ্রিল মাসও শেষ হয়ে গেছে। লঞ্চের ইনচার্জ মাঝে মধ্যে এসে বাবুর্চিকে আমাদের খাওয়ার টাকা দিয়ে যান। এছাড়া আর খবর নেন না। লঞ্চের ৩২ জন স্টাফের মধ্যে ১৭ জন বিনা বেতনে ছুটিতে আছেন। আর ১৫ জন লঞ্চে আছি। মালিক জানিয়েছেন, যারা ছুটিতে গেছেন তাদের বেতন দেওয়া হবে না।

About Gazi Mamun

Check Also

দৌলতপুরে অভিযানের ৮৫ কেজি ইলিশ দেওয়া হলো মাদ্রাসায়

দেওয়ান আবুল বাশার, স্টাফ রিপোর্টার: প্রধান প্রজনন ইলিশ রক্ষায় ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *