জাপানি গাড়ির কেন্দ্র হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ‘আড়াইহাজার’

এশিয়ায় জাপানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কেন্দ্র হতে চলেছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চল হরিশ্চন্দ্র সরকারের বাড়ি গাইবান্ধায়। সেখানে বিদ্যুতের কাজ করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণে হিমশিম

খেতে হতো তাঁকে। তাই বছরখানেক আগে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড), যেটি গড়ে তোলা হচ্ছে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য। এখানে এখন একই কাজ করে মাসে ৩০ হাজার টাকা

আয় করেন হরিশ্চন্দ্র। ফলে তাঁর আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শুরু হয় চার বছর আগে। গত শনিবার সরেজমিনে দেখা গেল, চার শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন, যাঁরা দেশের বিভিন্ন জেলা

থেকে এসেছেন। তাঁদের কেউ ভূমি উন্নয়ন, কেউবা অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যস্ত। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন অনেকে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলটির অবকাঠামো উন্নয়নে জড়িত আছেন বাংলাদেশ, জাপান, ফিলিপাইন ও মিসরের ৪২ জন প্রকৌশলী। বেজা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে মূলত অটোমোবাইল, অর্থাৎ গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপিত হবে।

সেই সঙ্গে সেখানে গাড়ির যন্ত্রপাতি সংযোজন, মোটরসাইকেল, মোবাইল হ্যান্ডসেটসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রপাতি উৎপাদিত হবে। সেখানে বিনিয়োগ করতে এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানের টয়োটা, মিতসুবিশি, সুমিতোমো, তাওয়াকি, সুজিত প্রভৃতি কোম্পানি। সব ঠিকঠাক থাকলে এশিয়ায় জাপানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের কেন্দ্র হবে আড়াইহাজার অর্থনৈতিক

অঞ্চল—এমন ঘোষণাই দিয়ে রেখেছে জাপান সরকার। বেজা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য মোট এক হাজার একর জায়গার ওপর গড়ে উঠছে আড়াইহাজার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। প্রথম পর্যায়ে ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ। এখন সেই জমি উন্নয়নের কাজ চলছে। ১৫ কিলোমিটার দূরের মেঘনা নদী থেকে পাইপলাইনে বালু এনে

ভূমি উন্নয়ন করছে জাপানি প্রতিষ্ঠান তোয়া করপোরেশন। সমতল থেকে ১৫ ফুট উঁচু করা হচ্ছে জায়গাটি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এলাকায় শ্রমিকদের যাতায়াতের কারণে সেখানে সব সময় যানজট লেগেই থাকে। সেটি মাথায় রেখেই আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে আট কিলোমিটার

দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে শ্রমিকেরা যেকোনো প্রান্ত থেকে ওয়াকওয়ে দিয়ে চলাচল করতে পারেন। আর আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হওয়ায় সেখানে যাতে যানজট তৈরি না হয়, সে জন্য একটি উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হবে। ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে চলাচলকারী যানবাহনগুলো উড়ালসড়ক ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে চলতে পারবে। বেজার কর্মকর্তারা জানান, চার বছর আগে আড়াইহাজার

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোর তেমন আগ্রহ ছিল না। অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য তখন জাপানি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর, নরসিংদীর পলাশ, ঢাকার সাভার ও মানিকগঞ্জ। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর তুলনামূলক কাছে হওয়ায় এবং যোগাযোগব্যবস্থা ভালো দেখে শেষ পর্যন্ত তারা আড়াইহাজারকে বেছে নেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন শুরু করবে, এমনটাই আশা করছে বেজা। ব্যাপক সম্ভাবনা আর আশাবাদ থাকা সত্ত্বেও

আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী কোম্পানিগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া নিয়ে চিন্তায় আছে। কারণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। কিন্তু আরইবির সেবার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। তাই সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বেজা ও সুমিতিমো করপোরেশন মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। প্রথমে ৩৫ মেগাওয়াট ও পরে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় তারা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ চায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব তারাই পালন করবে। বেজার কর্মকর্তারা বলছেন, ভারী শিল্পের জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।

আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছে জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সার্টিফ আইডি। তাতে দেখা গেছে, সেখানে যেসব ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, সেগুলোর জন্য প্রচুর কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের কারিগরি দিক থেকে দক্ষ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে যে ধরনের জনবল দরকার, তা জোগান দেওয়া কঠিন হবে। এ জন্য অন্য দেশ থেকে দক্ষ জনবল আনতে হবে। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। তবে আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বড় ধরনের

রূপান্তর ঘটবে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আমরা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করছি। তাঁরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। আমরা সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছি।’ পবন চৌধুরী আরও বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।

About Gazi Mamun

Check Also

কুমিল্লার পূজামণ্ডপ থেকে ফেসবুক লাইভ করা সেই ফয়েজ গ্রেপ্তার

কুমিল্লা নগরীর একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন পাওয়ার অ’ভিযোগ তুলে ফেসবুকে লাইভ করা সেই ফয়েজ আহমেদকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *