এক অসামান্য উদ্ভাবক কৃষক হরিপদ কাপালী

প্রত্যন্ত গ্রামের একজন অক্ষরজ্ঞানহীন দরিদ্র কৃষক কি কখনো কৃষি বিজ্ঞানী হতে পারেন? হতে পারেন উদ্ভাবক? যার ঘর ভাঙাচোরা, বর্ষায় যার ঘরের চাল চুয়ে জল পড়ে। খরা কিংবা বন্যায় ধানের আবাদ নষ্ট হলে

সারাবছর চলতে হতো ভীষণ অভাবে। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাকে তীব্র শীতে কিংবা অঝোর বৃষ্টিতে হাজির হতে হয় নিজের কর্মক্ষেত্র ফসলের মাঠে, যাকে জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড খরতাপে মাথাল মাথায় ছুটতে হয় ক্ষণিক বিশ্রামের আশায় কোনো এক

বৃক্ষের তলে। যার কপালে নেই কোনো গবেষকের ডক্টরেট ডিগ্রি, যার আধুনিক গবেষণা সরঞ্জামাদি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরি নেই, যার ল্যাবরেটরি ফসলের মাঠ অথচ সেই কৃষকই যে একটি জনপদের ধান উৎপাদনের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবে তাই ঘটেছে। একদিন সকালে নিজের ইরি ধান

খেতে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ধান গাছের শীষ দেখতে পেলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার অক্ষরজ্ঞানহীন দরিদ্র কৃষক হরিপদ কাপালী। সেই ধানগাছের ছড়াতে ধানের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং ধান গাছটিও ধানে ভারী পুষ্ট। অথচ আর কোনো ধান নেই সেটি ছাড়া। তো এই ভিন্ন ধরনের ধান গাছ দেখে হরিপদ কাপালী সে ধানটিকে আলাদা করে রাখলেন। এরপর বীজ সংগ্রহ করলেন

যখন ধানগাছ পরিপক্ব হলো। সেই একটি ছড়ারই বীজ নিলেন তিনি। এর পরের বছর ওই গোছার বীজ নিয়ে নিজের আঙ্গিনায় মোটামুটি পরিসরে বীজের জন্য আবাদ করলেন তিনি। এবারও বেশ ধান হলো। তিন বছর ধরে অনেকটা ধান নিজে চাষ করলেন। তার পরের বছর ৯০ ভাগই উপহার দিলেন নিজের চারপাশের কৃষকদের। বললেন, এই ধানের ফলন অন্য ধানের তুলনায় বেশি। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য লাগলো। কারণ তারা

তখনকার সময়ের সবচেয়ে উচ্চ ফলনশীল বিআর-১১ ও স্বর্ণা ধান চাষ করেন। এর ফলন সেগুলোর থেকেও বেশি হবে, কারও বিশ্বাস হচ্ছে না। এই ধান এলো কোথা থেকে!
প্রায় সবাই নিজেদের খেতে বিআর-১১ ও স্বর্ণার পাশাপাশি হরিপদের দেওয়া নতুন ধানও লাগালেন। মৌসুম শেষে কাটতে গিয়ে কৃষকের চোখে-মুখে আশ্চর্যের ছোঁয়া। দেখা গেল, বিআর-১১ কিংবা স্বর্ণার চেয়ে উচ্চফলনশীল ধান এটি। তখন বিঘাপ্রতি

বিআর-১১ ধানের সর্বোচ্চ ফলন ছিল ১৮ মণ আর হরিধানের ফলন হলো বিঘাপ্রতি ২২ মণের মতো। বিআর-১১ জাতের ধান ২০০৪ সালে ফলন হতো ৯-১০ মণের মতো, অথচ হরিধান হয় ১৮-২০ মণের মতো। সে বছর ঝিনাইদহ জেলার বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল হরিধানের কথা। অনেকেই হরিপদ কাপালীর কাছ থেকে বীজ নিয়ে চাষ করলেন নিজের জমিতে। মজার বিষয় হলো, এই ধানের উৎপাদন খরচ অন্য ধানের তুলনায় অনেক

কম। যেখানে অন্য যেকোনো জাতের ধান তখন চাষ করতে খরচ হতো পনেরশ টাকা, সেখানে হরিধান চাষ করতে খরচ পড়তো ৮০০ টাকারও কম। আবার খেতে ধান উৎপাদনে সার এবং ওষুধও লাগতো তিন ভাগের এক ভাগ। স্বর্ণা ও বিআর-১১ জাতের ধানে দুই থেকে তিনবার ইউরিয়া সার দিতে হয়। হরিধানের ক্ষেত্রে একবার সার দিলেই চলে। অন্যদিকে, এই ধানগাছ বেশ মোটা হয়। ধানের কাণ্ড শক্ত ও মোটা হওয়ায় পোকা আক্রমণ করতে

পারে না সহজে। হরিধান তুলনামূলক অন্য ধানের চেয়ে লম্বা হওয়ায় এই ধানের খড়ের চাহিদাও বেশী। সেসময় হাজার আঁটি খড় বিক্রি হতো পাঁচশো টাকা দরে। যেখানে অন্য খড় ছিল ৩২০ টাকা। ১৯৯৪ সালের দিকে ঝিনাইদহসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে নাম পরিচয়বিহীন এই জাতের ধানের আবাদ ছড়িয়ে পড়ল ব্যাপকভাবে। অথচ তখনো কোনো মিডিয়া কাভারেজ পায়নি, টেলিভিশনের বালাই ছিল না। দরিদ্র সব কৃষক, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। ফলনের কারণে এই ধানের বীজ নিয়ে চাষিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেল। এমন অনেকেই বীজ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দরিদ্র কৃষক হরিপদ কাপালীর একবারের জন্যও কখনো

মনেই হয়নি, এই ধানের বীজ দিয়ে ব্যবসা করা যায়। তিনি পরম মমতায় কৃষকদের হাতে তুলে দিলেন নতুন এই ধানের বীজ। সঙ্গে তার কাতর অনুরোধ, ভালো লাগলে অন্যকেও দেবেন। তার অবস্থান হয়তো দরিদ্র, কিন্তু মন ছিল আকাশের মতো।
ঝিনাইদহ ছাড়িয়ে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল এই ধান। হরিপদ কাপালীর নামেই স্থানীয়রা এই ধানের নাম দিয়েছিলেন হরিধান। ১৯৯৫ সালে প্রথম পত্রিকার নজরে এলো এই ধানের তথ্য। সে বছর যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার ঝিনাইদহ প্রতিবেদক আসিফ কাজল হরিধান ও হরিপদ কাপালীর ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ততদিনে

দক্ষিণাঞ্চলে ভেতরে ভেতরে এক বৈপ্লবিক জোয়ার ঘটে গেল ফলনের। তখন এটি স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নজরে আসে। অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা হরিপদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করার জন্য গাজীপুর ব্রি (BRRI) এবং চুয়াডাঙ্গা বীজ গবেষণা কেন্দ্রে পাঠালেন। কিছু প্রদর্শনীতে চাষাবাদও শুরু করেন। একইসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা গবেষণা কেন্দ্রের নিজস্ব জমিতে চাষাবাদ শুরু হয় এই ধানের। যদিও, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট তখন বলল, ‘হরিধান আসলেই বিআর-১১ বা স্বর্ণা ধানের জাতের সামান্য হেরফের। এটা কোনোক্রমেই নতুন জাত না।’ হতাশ হয়ে পড়লেন অনেকে।

এমন সময় ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের নজরে এলো হরিধানের বিষয়টি। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পদক্ষেপ নিলেন। তার অনুরোধে গবেষণায় রাজি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ। ১০ কেজি স্বর্ণা আর ১০ কেজি হরিধান জোগাড় করে আনা হলো। রাউজান-১ আর রাউজান-২ কোড নাম দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে পাঠানো হলো। সেখানে রোকাইয়া বেগম ও তার গবেষণা দলের গবেষকরা গবেষণা করে জানালেন, ‘হরিধান আসলেই একটি নতুন জাতের ধান। মোটেই বিআর-১১ নয়।’ হইচই পড়ে গেল বহু জায়গায়। সেই গবেষণা প্রতিবেদন ছাপা হলো বিশ্বখ্যাত এক আন্তর্জাতিক জার্নালে। একজন কৃষক কতটা স্বপ্নবান আর নির্লোভ হলে হয়ে উঠেন এক কিংবদন্তির রূপে? হরিপদ কাপালী আমাদের বার বার মনে করিয়ে দেন এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় গবেষকের নাম কৃষক। এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্পীর নাম কৃষক। হরিপদ কাপালী জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আসাননগর গ্রামে। বাবা কুঞ্জলাল কাপালীও ছিলেন কৃষক। প্রচণ্ড অভাব আর পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে প্রথম শ্রেণীর বেশি পড়তে পারেননি হরিপদ কাপালী। মাত্র নয় বছর বয়সেই বাবাকে মাঠে সাহায্য করতেন তিনি। ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক ভরণপোষণের দায়িত্ব তার কাঁধে চাপে। নিজেদের মাত্র দুই বিঘা জমিতে চাষবাস শুরু করেন তিনি। ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন একই গ্রামের সুনীতি রাণীকে। নিঃসন্তান ছিলেন হরিপদ কাপালী, যদিও পরিবর্তিতে রূপকুমার নামের এক ছেলেকে দত্তক নিয়ে লালনপালন করেছিলেন। তবে, তার সন্তান ছিল ফসলের মাঠ ও মাটি।

About Gazi Mamun

Check Also

শখের বসে করা ছাগলের খামারে তিন বছরে ১৫ লাখ টাকার বাজিমাত!

নাম শিবলী নোমান। ২০০১ সালে এসএসসি পাশের পর নানা প্রতিবন্ধকতায় বন্ধ হয়ে গেল পড়াশোনা। জীবিকার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *