পেঁয়াজ বীজ চাষ করে কোটিপতি, হার না মানা নারী উদ্যোক্তা শাহিদা!

দেড়যুগ ধরে চাষ করছেন পেঁয়াজ বীজ। পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজ চাষ করে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। হয়েছেন দেশের সেরা নারী কৃষক। বীজ বিক্রি করে আয় করেছেন কোটি কোটি টাকা। ২০২০ সালে সেরা নারী কৃষক হিসেবে

পেয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড চ্যানেল আই এগ্রো অ্যাওয়ার্ড। তিনি হচ্ছেন ফরিদপুরের পেঁয়াজ বীজ চাষি শাহিদা বেগম। জেলা সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে তার বাড়ি। শাহিদা বেগম পেঁয়াজের বীজ চাষ করে শুধু আত্মনির্ভরশীল নন বরং অনন্য উদাহরণ

স্থাপন করেছেন। গতবছর তার চাষ করা দুইশ মন পেঁয়াজ বীজ বিক্রি করে পেয়েছেন ৪ কোটি টাকা। এছাড়াও এরই মাঝে তিনি ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (বিএডিসি) চুক্তিবদ্ধ কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

সূত্র জানায়, ফরিদপুর জেলায় চলতি বছরে ১ হাজার ৭১১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ আবাদ করা হয়েছে। যা থেকে ১ হাজার ২৬ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যার মধ্যে দেশের মোট চাহিদার পেঁয়াজ বীজের ৪ ভাগের ১ ভাগ বীজ আসে শাহিদা বেগমের উৎপাদিত খান বীজ থেকে। স্থানীয়

কৃষক তো বটেই, পুরো দেশের চাষি তার বীজ সরবরাহ করে থাকেন। তার বীজ ভালো বলে চাহিদা থাকে। কৃষকরাও অনেক খুশি। শাহিদা বেগমের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের কাজে সহায়তা করেন তার স্বামী বক্তার উদ্দিন খান। তিনি পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। চাকরি করেন সোনালী ব্যাংকে। শাহিদা বেগম গড়ে তুলেছেন পেঁয়াজ বীজের কারখানা। সেখান থেকেই বীজ

প্যাকেটজাত করে ক্রেতার কাছে সরবরাহ করা হয়। তার তৈরি করা বীজ ক্রেতার কাছে পরিচিত ‘খান বীজ’ নামে। তার উৎপাদিত পেঁয়াজ বীজ হলো- তাহেরপুরী, সুখ সাগর, নাসিক কিং, বারী-১, বারী-৪, বারী-৫। এলাকার কৃষক আলমাছ সেখ বলেন, ‘আমরা আগে অন্য ফসল চাষ করতাম; এখন পেঁয়াজ বীজ চাষ করি। কারণ শাহিদা বেগম যেভাবে এলাকায় পেঁয়াজ চাষ করছেন, সেটা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের এই চাষে আসা। এখন ভালো লাভ পাচ্ছি। দিন দিন চাষের এলাকা বাড়ছে।’

সুমন জোমাদ্দার বলেন, ‘শাহিদা বেগম শুধু পরিবর্তন করেননি। পেঁয়াজ চাষে তার সফলতা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার দেখাদেখি এখন অনেক জমিতে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজের চাষ শুরু করেছি। এখন আমার বাড়িতে বিল্ডিং হয়েছে। এভাবে যদি চাষ করতে পারি, তাহলে পেঁয়াজের কোন ঘাটতি থাকবে না দেশে।’
মানিকগঞ্জ থেকে আসা বীজ ব্যবসায়ী রইচ মেম্বার বলেন, ‘আমি এ বীজের ব্যবসা করছি অনেক বছর। ফরিদপুর থেকেই বীজ কিনে নিয়ে ব্যবসা করি। তখন এমন বিপ্লব দেখিনি। শাহিদা বেগম বীজ চাষে আসার পর থেকে এই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে।

একজন নারী পেঁয়াজ বীজ চাষি একশ থেকে দেড়শ বিঘা জমিতে চাষ করছেন, যা সারাদেশ তো বটেই; বিশ্বের কোথাও নেই।’
শাহিদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষক পরিবারের বউ হওয়ায় আগে থেকেই নানা কৃষিকাজের সাথে পরিচয় ছিল। আমার শ্বশুর মূলত পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে আগ্রহী ছিলেন। আমার মনে হলো করে দেখি, তাই করলাম। ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগে ২০ শতক জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ করি। সে বছর মাত্র দুই মণ বীজ হয়েছিল। সেগুলো বিক্রি করে পেয়েছিলাম ৮০

হাজার টাকা তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে বীজ বিক্রি করে দেখলাম যে, আমি ভালোই লাভবান। আস্তে আস্তে জমি বাড়াই। এভাবেই আমার ওঠা। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। গতবছর ৩০ একর জমিতে চাষ করেছিলাম। ঘরে তুলেছিলাম ২০০ মণ বীজ। এবার মোট ৩৫ একরের উপরে জমিতে চাষ করেছি। অনেক শ্রম দিতে হয়, কষ্ট করতে হয়। বীজের অনেক যত্ন করতে হয়।’
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো. হজরত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ

বীজের চাষে শাহিদা বেগম একটি নাম নয়; একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার পেঁয়াজ ও বীজের কারণে সামনের দিনে দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি আর থাকবে না বলে মনে হচ্ছে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে অসামান্য সাফল্য অর্জনকারী নারী উদ্যোক্তা শাহিদা বেগম। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবর্তিত কৃষি প্রণোদনার ওপর ভর করে এ ধরনের লাখ লাখ শাহিদার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলেছে আজকের বাংলাদেশ। শাহিদা বেগমের পেঁয়াজ বীজ সারাদেশের পেঁয়াজ চাষে যে ভূমিকা রাখছে, তা একটি জেলার জন্য গর্বের।’

About Gazi Mamun

Check Also

সাকিব আল হাসানকে গরু উপহার দিয়ে হজ্ব করতে চান কৃষক-কৃষানি। তুমুল ভাইরাল ভিডিও-

মুন্সিগন্জ জে’লার প্রবাসী পলা’শ লালনপালন করলেন সেই জে’লার সবচেয়ে বড় গরু। পলা’শ এবং তার স্ত্রী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *