কিছুতেই থামছে না মায়ের বুকফা’টা আহাজারি

সকালে একসঙ্গে বসে নাশতা করেছে দুজন। চা-রুটিসহ ছিল বিভিন্ন খাবার। মেয়ের কথা শুনে আর শারীরিক অবস্থা দেখে খুশি ছিল মা। দুপুরে বাড়ি ফেরার কথা ছিল মা মেয়ের। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হলো না মেয়ের। ক্ষণিকের

ব্যবধানে শ্বাসক’ষ্টজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃ’ত্যু হয় মেয়ের। অথচ দুই ঘণ্টা আগেও সবকিছু গুছিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি ছিল সবার। বাড়ি ফিরেছে মেয়ের নিথর দেহ। করোনার উপসর্গ নিয়ে এভাবেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন

রেখা আক্তার নামে এক গৃহবধূ।
মেয়ের মৃ’ত্যু যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মা। লা’শের পাশে বসে মেয়েকে বারবার ডেকে তোলার চেষ্টার কমতি ছিল না মায়ের। কোনোভাবেই মানছেন না তার মেয়ে এ পৃথিবীতে নেই। মায়ের বুকফা’টা আহাজারিতে কেঁ’পে উঠেছে হাসপাতালের

প্রতিটি করিডোর। এ কান্না যেন কোনোভাবেই থামছে না। কখনো করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডের ভেতরের ফ্লোরে কখনো বা হাসপাতালের সামনের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মেয়েকে হারানোর ব্যথায় শোকে কাতর মায়ের কান্নার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে সবাই। মেয়ে হারানোর এই ব্যথা নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক মায়ের।

করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃ’ত্যু হয় মেয়ে রেখা আক্তারের। মৃত রেখা আক্তার উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের হারিউন্দ গ্রামের মহিউদ্দিন সরকারের স্ত্রী। একই গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ রেহানা খাতুনের সন্তান। চার সন্তানের

মাঝে রেখা সবার বড়। বিশ বছর আগে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অনেকটা পাগলের মতোই হয়ে গেছিলেন মা রেহানা। এরপর তিন মেয়ে সন্তানের দিকে চেয়ে ছেলের শোকে কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও নতুন করে আবারো সন্তান হারানোর ব্যথায় আকাশ ভে’ঙে পড়েছে মায়ের মাথায়। পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত

কয়েকদিন ধরে পেটের পাতলা পায়খানা জনিত সমস্যায় ভু’গছিলেন রেখা আক্তার। গত মঙ্গলবার রাতে সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় বুধবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন তিনি। তবে তার শরীরে হালকা জ্বরসহ করোনাজনিত লক্ষণ থাকায় চিকিৎসকরা করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। দুপুরে হঠাৎ তার শ্বাসক’ষ্ট জনিত সমস্যা বেড়ে গেলে

অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেলে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃ’ত্যু হয় তার। এদিকে উপজেলায় করোনা আ’ক্রান্ত ও মৃ’ত্যুর সংখ্যা বাড়লেও এখনো সচেতনতা বাড়েনি মানুষের মাঝে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃ’ত্যুর খবর শুনে অনেকেই করোনা আইসোলেশন সেন্টার এসে মৃ’ত রোগীকে দেখতে ভিড় জমায়। অথচ নীরব এই ঘাত’ক নীরবেই মানুষের মাঝে মৃ’ত্যুর জাল বিছিয়ে নিঃস্ব করছে শত শত পরিবার। মা রেহানা খাতুন বলেন, দুপুরেও আমার মেয়ে

অসুস্থ ছিল। আমরা একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছি। অনেকক্ষণ কথা বলছি আমার মেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল। আজকেই আমরা বাড়িতে চলে যেতাম। কিন্তু দুপুরের পর থেকে মেয়েটার শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। পরে ডাক্তাররা এসে অক্সিজেন দিয়েছে। কিন্তু একটু পর থেকে দেখি মেয়ে আমার আর কথাও বলে না। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির করেও কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। পরে ডাক্তাররা জানাল আমার মেয়ে মা’রা গেছে। আমার মেয়ের কোনো করোনা নেই, আমার মেয়ের পেটের সমস্যা ছিল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার তানজিরুল ইসলাম রায়হান জানান, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পাতলা পায়খানারসহ করোনার উপসর্গ ছিল তার। আমরা আইসোলেশন সেন্টার রেখে তার চিকিৎসা দিয়েছিলাম তবে আজ বিকেলে উপসর্গ নিয়ে তার মৃ’ত্যু হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং যথাযথ নিয়মে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। লা’শ দা’ফন কা’ফনের ব্যাপারেও পরিবারের মানুষদের বিশেষ সর্ত’কতা অবলম্বন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

About Gazi Mamun

Check Also

বাড়িতে বাড়িতে দরজায় চিরকুট-টাকা রেখে ক্ষমা প্রার্থনা

কুড়িগ্রাম নাগেশ্বরী উপজেলায় চিরকুট লিখে রাতের আঁধারে বিভিন্ন ঘরের দরজায় টাকা রেখে গেছেন অজানা ব্যক্তি। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *