তালেবানদের বিরুদ্ধে আফগান সেনারা কেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি?

আফগানিস্তান এমন একটা দেশ যা শেষ করেছে অনেকগুলো সম্রাজ্য। এ কারণে আফগানিস্তানকে সম্রাজ্যখেকো দেশ বলা হয়। ওখানে ঢোকা কঠিন কিন্তু ওখান থেকে বের হওয়া আরও কঠিন। ওখান থেকে বেড় হওয়ার সময়

এত বেশি খেসারত দিতে হয় যে পরাশক্তিগুলো পর্যন্ত ভেঙে খান খান হয়ে যায়। এখন মার্কিনিরা আফগানিস্তান ছেড়ে পালাচ্ছে আরেকটা ভিয়েতনামের পুনরাবৃত্তি ঘটলো আফগানিস্তানে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কারিশমা এখন ধুলোয়

লুণ্ঠিত। দেশটির মধ্যের রাজনীতিতে এখন আফগানিস্তানে পরাজয় নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। অবস্থা এতোই বেগতিক যে বাইডেন নিজে দায় এড়াতে ব্যাখ্যা বিবৃতি দিচ্ছেন ভিয়েতনাম থেকে মার্কিনিদের পলায়ন যে অপমানজনকভাবে হয়েছিল ঠিক সেরকম ভাবেই পলায়ন করতে হয়েছে আফগানিস্তান থেকে।

১৯৭৫ সালে আমেরিকা ভিয়েতনামে এমন পরাজয়ের স্বীকার হয় যে তখন তাদের দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা বাইরে বেড় হওয়ার সুযোগটুকু পায়নি। দূতাবাসের ছাদে হেলিকপ্টার নামিয়ে সেখান থেকে মার্কিনিদের নিয়ে আসতে বাধ্য হয় তখন। অর্থাৎ তারা বিমানবন্দর থেকে পালানোর সুযোগটুকু পর্যন্ত পায়নি। এখন

কাবুলেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ফিরিয়ে নিতে দূতাবাসে হেলিকপ্টার নামাতে বাধ্য হয়। এই অপমান আর লজ্জার পরও শিক্ষা হয়নি নির্লজ্জ এই সাম্রাজ্যবাদী দেশটির। এখন কাবুল বিমানবন্দরে চলছে পুরো এক অরাজক পরিস্থিতি। ঈদের সময় আমাদের দেশে মানুষ যেভাবে লঞ্চে, বাসে বা ট্রেনে ওঠার জন্য

প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় ঠিক তেমনি হাজার হাজার আফগান বিমানে ওঠার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে কাবুল বিমানবন্দরে। সেখানে আমেরিকাগামী বিমানে উঠতে গিয়ে ৫-৬ জন লোক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা ভিডিওতে বিমান বন্দরে লাশ পড়তে থাকতে দেখা যায়। কেউ নেই লাশ তুলে নেয়ার সবাই ছুটছে দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য। এদের বেশিরভাগই হলো যারা কোন না কোন ভাবে মার্কিনিদের

এবং অন্য বিদেশি দখলদারদের সহযোগিতা করছে গত ২০ বছরে।
মার্কিন সেনারা বিমানবন্দরের পুরো দায়িত্ব নিয়েছে ঠিকই কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশ ছাড়তে তারা তালেবানের কাছে আরও কিছু সময় চেয়েছে। আসলে তালেবানের দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদেরকে করেছে আরও শক্তিশালী। সাবেক রাষ্ট্রপতি আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কোনো রক্তপাত

ছাড়াই পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। অনেকে এটাকে এরকম ভাবেই তুলনা করেন যে, আমেরিকা ২০ বছরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং সমরাস্ত্র ব্যবহার করে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে আফগানিস্তানে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কিন্তু তালেবান মাত্র কয়েক সপ্তাহে বিনা রক্তপাতে, পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলো। তাহলে আসল সন্ত্রাসী কে? এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্লজ্জভাবে ঘোষণা দিয়েছেন আফগানিস্তানে নাকি তাদের

‘বিজয়’ হয়েছে! মার্কিনিদের গড়া আফগান সেনারা কেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি? যদিও এই ক্ষমতার পালাবদলের পেছনে আছে অনেক দেন-দরবার, দেয়া-নেয়া, চুক্তি আর সমঝোতা। তবুও মার্কিন আগ্রাসন শেষ হচ্ছে আফগানিস্তানে এটাই বড় কথা।
২০ বছর পর এখন আবার ক্ষমতায় আসছে তালেবান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা তাদের পূর্ববর্তী প্রাকটিস থেকে বিরত থাকবে বলে জানিয়েছে। নারী শিক্ষা এবং নারী ক্ষমতায়নের

বিষয়েও তাদের পূর্ববর্তী মনোভাব প্রবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন তারা একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে আগ্রহী। অনেকেই প্রশ্ন করেন, মার্কিনিদের টাকায় পালিত সৈন্যরা কি আসলেই এতো দুর্বল যে, তারা তালেবানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই পারলো না। মার্কিনিরা বিশ্বের যে দেশেই এরকম সেনা তৈরি করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে সেখানেই এরকম হয়েছে। মার্কিনিরা আসলে তাদের স্টাইলে একটা বাহিনী করতে চান সব দেশে। জোড় করে, ভয়

দেখিয়ে প্রলোভন দিয়ে মানুষকে কাছে টানে। যার ফলে কখনও সুযোগ আসলেই ওই লোকগুলো তাদেরকে পরিত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। আর আফগানিস্তানে আসলে বিষয়টি সৈন্যদের দুর্বলতা বা খুব চৌকশ হওয়ার বিষয় না। মূল বিষয় হচ্ছে চুক্তি। কে কার সঙ্গে কি রকম চুক্তি করেছে। যেখানে আমেরিকা তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে পালাচ্ছে, মার্কিনিরা তালেবানের ক্ষমতা মেনে নিয়েছে, সেখানে তাদের গড়া এই সেনাবাহিনী কোন স্বার্থে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিবে?

এছাড়াও আমেরিকার এই চুক্তিতে তালেবানকে ক্ষমতায় বসাতে আশরাফ গনিকে বলি দেয়ার বিষয়টিও ছিল। মানে তালেবানের এই দ্রুত ক্ষমতা দখলে আমেরিকা-তালেবান চুক্তির একটা বড় ভূমিকা আছে। আফগান সরকারও জানে মার্কিনিরা তাদের ছুঁড়ে ফেলে এখন তালেবানের সঙ্গে প্রেমলীলায় মেতে উঠবে। তাই এখন তালেবানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারার সামিল। যাহোক, অবশেষে আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয় হয়েছে, মার্কিনিদের মুখে চুনকালি পড়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন শেষ হয়েছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা।(যদিও এ নিয়ে

আমি যথেষ্ট সন্দিহান।) এখন মার্কিনিদের মদদে বিভিন্ন দেশে যারা ক্ষমতায় আছে তাদের ভিতরে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকবে। স্বার্থ উদ্ধার হলে মার্কিনিরা যে কাউকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে পারে, তাদেরকে আগুণের মুখে ফেলে রেখে লেজুড় গুটিয়ে পালাতে পারে সে প্রমাণ আবারও দিলো মার্কিন সেনাবাহিনী। আর পশ্চিমা বেশিরভাগ গণমাধ্যম, এবং বিশেষজ্ঞরা যে সত্য প্রচারের পরিবর্তে ওখানকার রাজনীতিবিদ এবং সামরিক বাহিনীর পা চাটায় ব্যাস্ত সেটাও আরেকবার প্রমাণ হল।

লেখক: সরোয়ার আলম সূত্রঃ যুগান্তর

About Gazi Mamun

Check Also

‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করে’ মেয়েদের স্কুল খুলবে তালেবান

নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *