দেনার দায়ে দিশেহারা জেলেরা

বৈশাখ থেকে আশ্বিন-এ ছয় মাস ইলিশ মৌসুম। কাগজ-কলমের হিসেবে মৌসুমের অর্ধেক শেষ হয়েছে। কিন্তু দেশের দক্ষিণ উপকূলের নদ-নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না। মাছ পাওয়ার আশায় দিন-রাত উত্তাল নদীতে

ভেসে থেকে দেনার বোঝা ভারী করে শূণ্য হাতে ঘাটে ফিরছে জেলে ট্রলারগুলো। করোনার কঠোর বিধিনিষেধ চলমান থাকায় স্থানীয় শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সংকটকালে বিকল্প উৎস থেকে আয়ের পথও পাচ্ছে না জেলেরা। ফলে হতাশায় খেয়ে

না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার জেলেরা।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাসন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছে। এদের মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২শ’ ৮১জন। বাকি জেলেরা অনিবন্ধিত রয়েছে। তাদের তালিকা করা হবে। একজন কামাল মাঝি। মা-বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে উপজেলার হাজারিগঞ্জ এলাকার বেড়িবাঁধে

বসবাস করছেন ৩৫ বছর ধরে। নদীতে মাছ ধরা পৈতৃক পেশাকে বেছে নিয়েছেন তিনি। সাত জনের সংসারের ঘানি টানছেন তিনি একাই। এ পেশায় বেশ দক্ষ হওয়ায় সামরাজ ঘাটের সমুদ্রগামী এক ফিশিং ট্রলারের মাঝি হিসাবে যোগ দিয়েছেন দশ বছর অগে।
তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমার ট্রলারে ১৫জন জেলে নিয়া নদীতে যাইতে বাজার খরচ হইছে ১ লাখ টাকা। কিন্তু ৫দিন নদীতে থাইক্যা (থেকে) ২০টা ইলিশ মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছি।

তেলের খরচও উঠাইতে পারিনি। দেনা করে সংসার চালাইতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হইব (হবে)অন্য এক ট্রলারের আনোয়ার মাঝি বলেন, ‘১৭ জেলের ট্রলার নিয়া টানা ৪দিন নদীতে থাইক্যা (থেকে) ১৫টা ইলিশ মাছ পাইছি। স্থানীয় বাজারে এই মাছের দাম সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা হবে। চারদিনের খাওয়া-দাওয়া ও তেল পুড়ে আমার ট্রলারের খরচ হইছে ১৯ হাজার টাকা
বেতুয়া ঘাটের ফারুক মাঝি বলেন, ‘করোনার কারণে কোন কাজ নাই। ৪-৫ মাস ধরে কাজ না থাকায় বেকার হয়ে পরেছি।

পরিবারে সদস্যের মুখে ভাত তুলে দেওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। মহাজন আর এনজিওর কাছে দেনা করছি প্রায় ২৫ হাজার টাকা। ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশের সংকটের কারনে মাহজনের দেনার বোঝা ভারি হচ্ছে। দেনার শোধ দেয়ার কোন উপায় নাই এভাবেই এবার লোকসান গুনছেন জেলেরা। ধারদেনা পরিশোধ তো দূরের কথা, নিজেদের তিনবেলা খাবারের অর্থ যোগাড়ই যেন তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ইলিশের মৌসুম বদলে গেছে। তাই পুরনো হিসেবে এখন ভরা মৌসুমে ইলিশের আকাল

চলছে এবং শীঘ্রই অবস্থার উন্নতি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশার কথা শুনালেও জেলেরা বলছে ভিন্ন কথা। জেলেদের দাবী বাংলাদের সমুদ্রসীমায় ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা লাশা-জাল ফেলে মাছ শিকার করছে এতে শুধু ইলিশই নয়, সব ধরনের মাছই ধরা পড়ছে। লাশা-জাল পেরিয়ে কোন মাছ উপকূলে আসতে পারছে না। ফলে ভারতীয় এবং মিয়ানমারের জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ পেলেও উপকূলীয় নদ নদীতে পাওয়া যায় না। ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা লাশা-জালে আটকে গেছে উপকূলের জেলেদের ভাগ্য। ঢালচর মৎস্য ঘাটের আড়তদার অহিদ বেপারী জানান, বৈশাখের মাঝামাঝি মৌসুম শুরু হয় এবং শেষ হয় আশ্বিনের শেষ দিকে। সাধারণতঃ ৩০ আশ্বিনকে মৌসুমের শেষ দিন ধরে হিসাব-নিকাষ করা হয়ে থাকে। প্রত্যেক যাত্রায়

আশানুরুপ মাছ পেতে অর্জিত লাভ থেকে আস্তে আস্তে জেলে, মাঝি এবং ট্রলার মালিক মহাজনের দাদন কেটে দিয়ে কমাতে থাকে। এভাবে দিতে দিতে এক সময় দাদনের টাকা পরিশোধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্ত এবছরে ইলিশ সংকটের কারনে বেশীর ভাগ জেলেদের দাদনের দায় পরিশোধ হবেনা। ঢালচর মৎস্য ঘাটের বিসমিল্লাহ ফিসের মালিক আব্দুস সালাম হাওলাদার জানান, গত মৌসুম শেষে জেলেদের হাতে তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ কোটি টাকার দাদন বকেয়া ছিল। এ মৌসুমে ওই দাদনের সাথে আরো ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এভাবে নদী-সাগরে ইলিশের সংকটের কারণে দাদনের পরিমান আরো ৫০ লাখ বেড়ে যেতে পারে। নদীতে মাছ না থাকায় এভাবে উপকূলজুড়ে জেলেদের দেনার পরিমান বাড়ছেই। চর কুকরি-মুকরি ইউপি চেয়ারম্যান

আবুল হাসেম মহাজন জানান, কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের প্রায় ১২শ’ জেলে মৎস্য আহরণে নিয়জিত রয়েছে। এসব জেলেকে বছরের একটা বড় সময় বেকার বসে থাকতে হয়। কিন্তু এ সময়ে তাঁদের সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। ঋণের বোঝা নিয়ে জেলেরা বিপাকে পড়েছে। নদীতে মাছ না থাকায় অনেক জেলে এ পেশা ছেড়ে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছে। জলেদেরকে ধারদেনা থেকে মুক্ত করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। চরফ্যাসন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মারুফ হোসেন মিনার জানান, অতিমাত্রায় লবনাক্ত পানির কারনে উপকূলীয় নদ-নদীতে ইলিশ মাছের বিচরণ কমে গেছে। তবে জুলাইয়ের শেষের দিকে জেলেরা আশানুরুপ ইলিশ মাছ পাবে বলে আশা করা যায়। এ উপজেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২শ’ ৮১জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিত জেলেদের নিবন্ধনের আওয়াতায় আনা হবে। উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা আল নোমান জানান,

চরফ্যাসন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছে। বেশিরভাগ জেলে ঢালচর, সামরাজ, বকসিঘাট, কুকরি-মুকরি, চর নিজাম, বেতুয়া মৎস্যঘাট এলাকার। উপজেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২শ’ ৮১জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার। অনিবন্ধিত এসব জেলেদের নিবন্ধনের আওয়াতায় আনার লক্ষে স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলে তালিকা তৈরি করা হবে। সাগরে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলেদের মাঝে দ্বিতীয় ধাপের ৫৬কেজি করে ভিজিএফ এর চাল বিতরণ করা হয়েছে। ঋণগ্রস্ত জেলেদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।

About Gazi Mamun

Check Also

খাদ্যের খোঁজে এসে ধানক্ষতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা হাতির মৃত্যু, আটক ১

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ খুনিয়াপালংয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে একটি বন্য মা হাতির মৃত্যু হয়েছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *