বলতে গেলে কিছুই করার সামর্থ্য নেই রহিম ও অলির। মাইক্রোসেফালি নামে বিরল রোগে আক্রান্ত

বলতে গেলে কিছুই করার সামর্থ্য নেই রহিম ও অলির। মাইক্রোসেফালি নামে বিরল রোগে আক্রান্ত তারা। ৪০ বছর ধরে দুই ছেলেকে চোখের আড়াল হতে দেননি তাহমিনা বেগম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই মায়ের গল্প বলছেন

পিন্টু রঞ্জন অর্ক মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাহমিনার। স্বামী ফানসুর আলী ছিলেন ফেরিওয়ালা। হাট-বাজারে ঘুরে শাড়ি, ব্লাউজ, গেঞ্জি ইত্যাদি বিক্রি করতেন। বিয়ের বছরখানেকের মাথায় তাহমিনার কোল আলো করে এলো পুত্র শাহাদাত। বছর চারেক পর আবারও পুত্রসন্তানের জননী হলেন। এবার এলো রহিম।

কিন্তু দিন যতই যাচ্ছিল, এই পুত্র তাহমিনার কপালে ততই দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলছিল। কারণ আর দশটি শিশুর মতো রহিম কথা বলছিল না।হাঁটতেও পারছিল না ঠিকঠাক। ভেবেছিলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। তাবিজ-ঝাড়ফুঁকও কম করেননি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষমেশ নিয়ে গেলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

ডাক্তার কইল, ছেলেটার মাথায় মগজ কম। মাথা আর বড় হইবে না।’ বললেন তাহমিনা। রহিমের জন্মের বছর চারেকের মাথায় এলো তার ছোট ভাই অলি। রহিমের অস্বাভাবিকতার যতগুলো লক্ষণ ছিল, যেন সব নিয়েই পৃথিবীতে এসেছে সে।
সেই দিন আর এলো না

এ দুই ছেলের জন্য সমাজের মানুষ আঙুল তুলেছে তাহমিনার দিকে। অপয়া, অলক্ষ্মী—হেন অপবাদ নেই, যা তাহমিনার কপালে জোটেনি। কেউ কেউ আবার বলত, জিন-ভূতের আছর পড়েছে। সহমর্মীও ছিল কেউ কেউ, বলত বড় হলে ভালো হয়ে যাবে। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। শহরে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাবেন সে সামর্থ্যও ছিল না তাহমিনার। বললেন, ‘এলাকার লোক যদি হাজার কথাও বলে, শুনি থাকছি। ব্যাটাদের তো আর মাইরা ফেলতে পারি না।’

শাশুড়ি ভালোবাসতেন
লোকে নানা কথা বললেও তাহমিনার শাশুড়ি খুব ভালোবাসতেন দুই নাতিকে। তাহমিনা বললেন, ‘কোনো দিন কোলের নিচে নামাইতে দিত না। নিজেই খাওয়াইত। গোসল করাইত।’ শাশুড়ি থাকার সময় হয়তো এক কি দুই দিন বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। ২০ বছর আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।এর পর থেকে বেড়ানো বা ঘোরার মতো শব্দগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে তাহমিনার অভিধান থেকে। ‘বাপের বাড়ি বা অন্য লোকের বাড়ি—কারো বাড়িতে যাই না। শাশুড়ি থাকা পর্যন্ত গেছিলাম।’
সময় গড়ায়। রহিম-অলি বড় হতে থাকে। তাহমিনা আশায় বুক বাঁধেন—একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ৪০ বছরেও সেই দিন আর আসেনি তাহমিনার জীবনে। তিনিও কখনো চোখের আড়াল করেননি নাড়িছেঁড়া ধন দুটিকে।

মা ছাড়া কিছুই বোঝে না
কষ্টেসৃষ্টে হাঁটাচলা ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই করতে পারে না রহিম-অলি। খাওয়ানো-পরানো তো বটেই, ওদের পায়খানা-প্রস্রাব থেকে শুরু করে সবই করে দিতে হয় তাহমিনাকে। মুখ দিয়ে শুধু নানা ধরনের শব্দ করে রহিম ও অলি। কিন্তু মা ছাড়া বাকি পৃথিবীর কাছে অর্থহীন সে শব্দ! তাহমিনা বললেন, ‘মা, ভুক লেগেছে, খাইতে দাও কি পানি দাও—কিছুই বলতে পারে না।পানির পিয়াসা লাগলে গলা খাঁকর দিবে। হামার হাত ছাড়া কারো হাতে খাইবে না। এমনকি হামার মেয়ের হাতেও না। (অলির পরে আমেনা নামে আরো এক কন্যার জননী হয়েছিলেন তাহমিনা)।

তাহমিনার একদিন
ফজরের সময় ঘুম ভাঙে তাহমিনার। মা বিছানা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রহিম-অলিও উঠে যায়। ওদের পায়খানা-প্রস্রাব করিয়ে নিয়ে আসেন। পরে নামাজ পড়েন তাহমিনা। এই ফাঁকে দুই ছেলেকে বাইরে থেকে হাঁটাহাঁটি করে আসতে বলেন। কিছুক্ষণ পর আবার তিনি গিয়ে নিয়ে আসেন। ততক্ষণে সূর্য উঠে যায়। তাহমিনা রুটি বেলতে বসেন। রান্নাঘরে মায়ের পাশে বসে থাকে দুই ভাই। ‘৭টা-৮টা বাজলে রুটি কইরা দিলাম। রুটির লগে কখনো লবণ, কখনো ভাজি বা কখনো একটা ডিম দিমু।’ তাহমিনাকেই খাইয়ে দিতে হয়। নাশতা সারার পর দুই ভাই খেলে বেড়ায় উঠানে।

কী নিয়ে খেলে? ‘বাড়ির ভেতরে মনে করেন যে একটা গাড়ি পাইলে গাড়ি দিয়া খেলল। খেলনা মাছ পাইলে মাছটাকে লিয়ে খেলল। মাছটাকে মনে করবে মোবাইল। কানে ধরে আও আও করবে।’ এভাবে দুপুর হয়ে যায়। গোসলের জন্য ছেলেদের কখনো পুকুরে যেতে দেন না। পাছে ডুবে যায়। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে টিউবওয়েল।সেখান থেকে পানি নিয়ে আসেন। সেই পানি দিয়ে গোসল করান দুই ছেলেকে। পরে দুপুরের খাবার খাইয়ে দেন। দুপুরে তাহমিনা ঘুমালে দুই ছেলেও ঘুমায়। ‘বিকালে হয়তো ধরেন আমি কোনো কাজ করি। ওরা পাশে থাকে।’ এভাবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আবার ৭টা কি সাড়ে ৭টার দিকে রাতের খাবার খাওয়ার পর মা-ছেলে বিছানায় চলে যান।

খেলনা পেলে খুশি
টক ও তিতা ছাড়া সব কিছুই খায় রহিম-অলি। তাহমিনা বললেন, ‘বিস্কুট, কলা, আপেল, কমলা—যেইটা দেবেন খাইব। ওরা খাইতে বড় ভালোবাসে। কিন্তু সব সময় পায় না। ব্যাটারা খেলনা জিনিসটা পাইলে বেশি খুশি।’ দুই ভাইয়ের মধ্যে ছেলেমানুষি ব্যাপারটা এখনো রয়ে গেছে। তাহমিনা বললেন, ‘ছোটটার রাগ বেশি। মাঝে-মইধ্যে বড়টাকে ঢুস মারে। কিন্তু বড়টা ছোটটাকে মারতে দিবে না। হামি যদি মারি হামাকে মারবে, তবু ছোটটাকে মারতে দিবে না।’

আমার চোখে লয় না
সাত বছর আগে ক্যান্সারে স্বামীকে হারিয়েছেন। এখন সম্বল বলতে একটি সেলাই মেশিন আছে তাহমিনার। আগে মানুষের জামাকাপড় সেলাই করে দিতেন। এখন চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখেন।তবু ছেলেদের জামা-প্যান্ট ছিঁড়ে গেলে নিজেই সেলাই করে দেন। বললেন, ‘ওর আব্বা বাঁইচা থাকতে সেলাই করছিলাম। এখন আমার চোখে লয় না তো। ওরা ছিঁড়াটিঁড়া ফেলে প্যান্ট, গেঞ্জি; ওইটা সেলাই করি।’

কেউ গালি দেয়, কেউ মারে
বয়স্ক ভাতার টাকা তোলা বা অন্য কোনো কারণে বাড়ির বাইরে যেতে হলে ছেলেদের ঘরের মধ্যে আটকে রেখে যান। কাজ সেরে দ্রুতই ফেরেন। বললেন, ‘রহিমকে বান্ধি আর অলি ঘরের ভেতরে চেয়ারে বসে থাকে। দরজা আটকিয়ে যাই।’ ওরা সুযোগ পেলেই আশপাশের বাড়িতে চলে যায়।তাহমিনা বললেন, ‘অন্য মানুষজন তো বিরক্ত খায়। সব মানুষ তো এক রকম লয়। কেউ গালি দেয়, কেউ মারে। নিজে যাইয়া ধইরা লিয়া আসি।’

বর্ষাকালে বেশি কষ্ট হয়
মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে শাহাদাতও বিয়ে করে আলাদা থাকে। তাহমিনা বয়স্ক ভাতা পান। দুই ছেলে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। তা দিয়ে খেয়ে-না খেয়ে দিন পার করছেন। নিজের জায়গা বলতে কিছুই নেই তাহমিনার। খাসজমিতে একটি ছাপরাঘরে থাকেন। বর্ষাকালে কষ্ট বেশি হয়।আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘ঘর বানাইতে পারি নাই বাবু। কইটা খুঁটি লাগাইয়া টিন বাইন্ধা দিছি। বহুতদিনকার টিন, পানি পড়ে।’

যদি মইরে যাই …
জীবনের স্বাদ-আহ্লাদ সবই বিসর্জন দিয়েছেন এই সন্তানদের জন্য। ষাটোর্ধ্ব তাহমিনা সারাক্ষণ ভাবেন, তাঁর কিছু হলে রহিম-অলির কী হবে? ‘হামার চোখেই দুনিয়া দেখে ওরা। যদি মইরে যাই, পাগল দুইটাকে কে দেখবে? হামি কান্দি একা একা ঘরে শুইয়া। দেখে রহিম কষ্ট পায়। সে-ও হামার লগে কান্দে। বলতে তো পারে না যে মা তুমি কান্দিও না। খালি আ আ করবে। খুব কষ্ট পাইলে হামার মাথার সঙ্গে মাথা লাগাইয়া আ আ করবে। আল্লাহর কাছে কয়েছি, তুমি হামার আগে লিও ছেলে দুইটাকে!’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে তাহমিনার।

(লেখাটি ‘কালের কন্ঠ’ এর ‘অবসরে’ প্রকাশিত ”কোনো এক মায়ের গল্প” শীর্ষক প্রতিবেদন)

About Gazi Mamun

Check Also

খাদ্যের খোঁজে এসে ধানক্ষতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা হাতির মৃত্যু, আটক ১

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ খুনিয়াপালংয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে একটি বন্য মা হাতির মৃত্যু হয়েছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *